কয়রায় কাজী সিন্ডিকেটের ভয়ংকর জালিয়াতি: অন্ধকারে ভুক্তভোগীরা
নিজস্ব প্রতিনিধি | কয়রার খবর (KK)
খুলনার কয়রা উপজেলা জুড়ে একশ্রেণীর অসাধু কাজী এবং জালিয়াতি চক্রের যোগসাজশে সাধারণ মানুষের অজান্তে সংসার ভাঙা ও ভুয়া আইনি নথিপত্র তৈরির এক মারাত্মক সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। সম্প্রতি উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ঘটে যাওয়া তিনটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা বিশ্লেষণ করে এই চক্রের ভয়ংকর জালিয়াতির রূপটি প্রকাশ্যে এসেছে, যা নিয়ে স্থানীয় সাধারণ মানুষের মাঝে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
কয়রার খবর-এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কয়রা ইউনিয়নে একটি জালিয়াতির ঘটনায় বিয়ের ৫-৬ মাস আগে ডিভোর্সের একটি ভুয়া এফিডেভিট (Affidavit) তৈরি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ওই বাতিল ও ভুয়া এফিডেভিটটি দেখিয়েই বিগত ১৭ই নভেম্বর ২০২৫ তারিখে অন্যত্র আরেকটি বিয়ে সম্পন্ন করা হয়। তবে ভুক্তভোগী স্বামী যখন এই অবৈধ বিয়ের বিষয়টি জানতে পেরে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করেন, তখন জালিয়াতি চক্রটি নিজেদের আইনি শাস্তি থেকে বাঁচাতে এক চরম জালিয়াতির আশ্রয় নেয়। তারা বিয়ের মাত্র এক মাসের মাথায়, ১৮ই ডিসেম্বর সম্পূর্ণ গোপনে ও স্বামী-স্ত্রীর অজান্তে কাজী অফিসে একটি পেছনের দরজা দিয়ে ডিভোর্সের ভলিউম এন্ট্রি করিয়ে নেয়। অথচ পরবর্তীতে স্ত্রীর নিজের দেওয়া মেসেঞ্জার চ্যাটিংয়ের ডকুমেন্ট ও স্বীকারোক্তিতেই প্রমাণিত হয় যে, তিনি নিজে এই ১৮ই ডিসেম্বরের অফিশিয়াল ডিভোর্সের ব্যাপারে সম্পূর্ণ অন্ধকার ছিলেন। তিনি এখনও ভাবছেন বিয়ের ৫-৬ মাস আগে করা ওই ভুয়া এফিডেভিটটিই বুঝি তার আসল ডিভোর্স পেপার ছিল। আইনি জটিলতা থেকে বাঁচতে স্বামীর অজান্তে কাজীর মাধ্যমে এই ব্যাক-ডোর ডিভোর্স করানো হয়।
কয়রা ইউনিয়নেরই অপর একটি ঘটনায় দেখা যায়, আরেক স্ত্রীর কাছে তালাকের নোটিশ পাঠানো হয়েছে এমন এক তারিখে, যেদিন ডাকবিভাগের নিয়ম অনুযায়ী দুপুরের পর কোনো চিঠি রেজিস্ট্রি করা সম্ভব নয়। অথচ, ডিজিটাল প্রমাণ ও ফোন রেকর্ডে স্পষ্ট দেখা গেছে—যার পক্ষ থেকে নোটিশ পাঠানো হয়েছে, সেই স্বামী কর্মস্থল থেকে এলাকায় এসে পৌঁছাতেই আসর পার হয়ে গেছে। যে মানুষটি দুপুরে এলাকায় উপস্থিতই ছিলেন না, তার অনুপস্থিতিতে কীভাবে একই তারিখে কাজী অফিস থেকে কাগজ তৈরি হয়ে ডাকবিভাগে এন্ট্রি হলো, তা একটি স্পষ্ট ব্যাকডেটেড জালিয়াতি প্রমাণ করে।
শুধু কয়রা ইউনিয়নই নয়, উপজেলার অন্য ইউনিয়নেও এই একই সিন্ডিকেটের থাবা বিস্তৃত হয়েছে। সেখানে আরেক ভুক্তভোগী যুবকের অজান্তে তালাকনামা তৈরি করে কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে—যুবক নাকি মুখে তালাক উচ্চারণ করেছেন। অথচ ভুক্তভোগী যুবক তার স্ত্রীকে কখনো তালাকই দেননি। এমনকি নিকাহনামার শর্ত অনুযায়ী, স্ত্রী কেবল তখনই তালাক দেওয়ার অধিকার রাখতেন যদি স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করতেন; কিন্তু ওই যুবক আজ পর্যন্ত কোনো দ্বিতীয় বিয়েই করেননি। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, পরবর্তীতে এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কাজীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিজের মুখে কয়রার খবর-কে জানান যে, মূল নিকাহনামা না দেখেই তিনি এই ডিভোর্স পেপার তৈরি করে ফেলেছেন! অর্থাৎ, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বা প্রভাবের কারণে এই কাজীরা প্রচলিত আইন ও কাবিননামার ন্যূনতম শর্ত বা সত্যতা যাচাই না করে ভুয়া কারণ দেখিয়ে মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে।
এলাকার সচেতন মহল মনে করেন, সমাজ ও পরিবারের বুক থেকে এমন নোংরা প্রতারণা ও জালিয়াতি দূর করতে অবিলম্বে প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। ইতিমধ্যেই এই পুরো চক্র এবং অসাধু কাজীদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির জালিয়াতি ও প্রতারণার সংশ্লিষ্ট ধারায় কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। একই সাথে উপজেলা জুড়ে সাধারণ মানুষকে তাদের অজান্তে কাজী অফিসে কোনো ভুয়া ভলিউম এন্ট্রি হচ্ছে কিনা, সে বিষয়ে চরম সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
সবশেষ খবর সবার আগে পেতে "কয়রার খবর" - এর সাথেই থাকুন। নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের koyrarkhobor.com ভিজিট করুন।
This theme has been developed by OURISLABD.


Post a Comment