কয়রার খবর
[islamsr] / results=[3] / label=[latest] / type=[headermagazine]
শিরোনাম ::
শিরোনাম ::

খালের ওপারে মিষ্টি পানির প্রাচুর্য, এপারে লোনা পানির হাহাকার: কয়রায় কোটি টাকার 'ওয়াটার এটিএম' এখন এক অপ্রয়োজনীয় আয়োজন!

প্রকাশঃ
প্রসেসিং হচ্ছে, দয়া করে অপেক্ষা করুন...


 কয়রা প্রতিনিধি | কয়রার খবর কয়রা, খুলনা

 সাতক্ষীরা ও খুলনা সীমান্তবর্তী কয়রা উপজেলার মদিনাবাদ এবং গোবরা গ্রাম—ভৌগোলিক মানচিত্রে মাঝখানে কেবল একটি খালের ব্যবধান। কিন্তু এই সামান্য দূরত্বের ভেতরেই লুকিয়ে আছে প্রকৃতির এক বিশাল ও নির্মম বৈপরিত্য। খালের ওপারে মদিনাবাদে মাটির সামান্য গভীরে গেলেই মিলছে সুপেয় ও মিষ্টি পানির সন্ধান। অথচ এপারে গোবরা গ্রামে যত গভীরেই নলকূপ স্থাপন করা হোক না কেন, লবণাক্ততার অভিশাপ থেকে মুক্তির কোনো উপায় মিলছে না। তীব্র লোনা পানি এখানকার সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের জীবনযাত্রাকে পুরোপুরি বিষিয়ে তুলছে।

এমন এক চরম পানি সংকটের বাস্তবতায় উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর, বিশেষ করে নারীদের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত লবণাক্ততা মোকাবেলায় অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি বিশেষ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (GCF) এবং ইউএনডিপি (UNDP)-এর অর্থায়নে "জেন্ডার-রেস্পন্সিভ কোস্টাল অ্যাডাপটেশন (জিসিএ)" প্রকল্পের আওতায় ‘এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথ’ মদিনাবাদ অংশে একটি আধুনিক "ওয়াটার এটিএম" (Water ATM) বা স্বয়ংক্রিয় পানির ট্যাব স্থাপন করেছে। তবে মদিনাবাদের যে স্থানে এই ব্যয়বহুল প্ল্যান্টটি বসানো হয়েছে, তার কার্যকারিতা ও স্থানীয় বাস্তবতার সামঞ্জস্য নিয়ে জনমনে তীব্র প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

'কয়রার খবর'-এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই আধুনিক ওয়াটার এটিএম-টি যেখানে স্থাপন করা হয়েছে, তার ঠিক পাশেই রয়েছে এই অঞ্চলের সবচেয়ে প্রাচীন ও সেরা মিষ্টি পানির একটি ঐতিহ্যবাহী টিউবওয়েল বা পানির কল। এই কলের পানি এতটাই সুপেয় ও চমৎকার যে, স্থানীয় বাসিন্দারা তো বটেই, এমনকি প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরবর্তী লবণাক্তপ্রবণ গোবরা গ্রাম থেকেও প্রতিদিন শত শত মানুষ এসে এখান থেকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে খাবার পানি সংগ্রহ করে নিয়ে যান।

এমতাবস্থায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জেগেছে, যেখানে হাতের নাগালে পাশেই সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এত ভালো পানি পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে কেন তারা নামমাত্র মূল্যে বা প্রতি ৫ লিটার পানির জন্য ১ টাকা খরচ করে এই এটিএম বুথ ব্যবহার করতে যাবেন? যার ফলে, উদ্বোধনের পর থেকে আধুনিক এই পানির ট্যাবটি সাধারণ মানুষের কোনো কাজেই আসছে না এবং স্থানীয়দের মাঝে এর কোনো প্রয়োজনীয়তাও তৈরি হয়নি। অথচ, খালের ঠিক ওপারেই গোবরা গ্রামের মানুষ প্রতিদিন একটু সুপেয় ও নিরাপদ পানির জন্য মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দিচ্ছেন এবং শত শত টাকা খরচ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

প্রকল্পের প্ল্যান্টে থাকা নির্দেশিকা অনুযায়ী, এই পানি বণ্টন


ব্যবস্থাটি রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার জন্য স্থানীয়ভাবে একটি "কমিটি" বা "ম্যানেজমেন্ট বডি" গঠন করা হয়েছে। কিন্তু যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক প্রচার ও জনসচেতনতার অভাব থাকায় স্থানীয় সাধারণ মানুষের মাঝে এই প্ল্যান্টটিকে ঘিরে এক ধরণের বিভ্রান্তি ও ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে। গ্রামের অনেকেই এটিকে নির্দিষ্ট কিছু মানুষের ব্যক্তিগত সম্পদ বা ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্যমূলক আয়োজন বলে মনে করছেন। সাধারণ মানুষ নিজের অজান্তেই এই ভুলটি করছে, নাকি কোনো স্বার্থান্বেষী মহল উন্নয়ন প্রকল্পটিকে বিতর্কিত করতে তাদের ভুল বোঝাচ্ছে—তা এখন এক বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাস্তব জমিনে প্ল্যান্টের সাইনবোর্ডগুলো পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, এখানে স্পষ্ট অক্ষরে এটিকে একটি অলাভজনক "ওয়াটার এটিএম" হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা কোনো বাণিজ্যিক বিক্রয়ের জন্য নয়। একই সাথে উপকূলীয় মানুষের নিরাপদ পানি সংরক্ষণের জন্য ৬টি জরুরি স্বাস্থ্যবিধি ও নিয়মাবলি সেখানে চিত্রসহ প্রকাশ করা হয়েছে। এছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো ধরণের অনিয়ম, দুর্নীতি, বৈষম্য বা হয়রানির শিকার হলে সরাসরি অভিযোগ জানানোর জন্য নির্দিষ্ট ইমেইল ও মোবাইল নম্বর সংবলিত একটি 'অভিযোগ নিরসন প্রক্রিয়া'র চার্টও ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সঠিক সম্ভাব্যতা যাচাই বা ফিজিবিলিটি স্টাডি না করে অপরিকল্পিতভাবে প্রকল্প গ্রহণ করার কারণেই এটি সাধারণ মানুষের কোনো উপকারে আসছে না। যেখানে ৩ কিলোমিটার দূরের মানুষ এক ফোঁটা মিষ্টি পানির জন্য হাহাকার করছে, সেখানে মিষ্টি পানির খনির ঠিক ওপরে এমন একটি কোটি টাকার প্ল্যান্ট বসানোকে পরিকল্পনাহীনতার এক স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে দেখছেন তারা। ভুক্তভোগী জনগণের দাবি, এই প্ল্যান্টের সুফল যেন মদিনাবাদের পাশাপাশি খালের ওপারে গোবরার মতো তীব্র লবণাক্ততায় আক্রান্ত মানুষের কাছেও পৌঁছে দেওয়া যায়, কর্তৃপক্ষ যেন দ্রুত সেই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করে।


সবশেষ খবর সবার আগে পেতে "কয়রার খবর" - এর সাথেই থাকুন। নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের koyrarkhobor.com ভিজিট করুন।

This theme has been developed by OURISLABD.
×

এই খবরের অডিও ভার্সন শুনতে নিচের প্লে বাটনে ক্লিক করুন

0:00 / 0:00 0%

একটি মন্তব্য করুন