সুন্দরবনের বুক চিরে কান্না: ঋণ ও দাদনের চক্রে পিষ্ট কয়রার লাখো বনজীবীর জীবন
ওবায়দুল কবীর | কয়রা প্রতিনিধি | কয়রার খবর
"পরিশ্রম করি ঠিকই, কিন্তু সুখ দেখি না। বনদস্যুর টাকা, মহাজনের দাদন, আড়তদারের দেনা, সব মিটিয়ে শেষে হাতে কিছুই থাকে না।" বুকভরা ক্ষোভ আর দীর্ঘশ্বাস নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন খুলনার কয়রা উপজেলার জোড়শিং গ্রামের জেলে আবু মুসা। তাঁর মতোই সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লাখো বনজীবীর জীবন এখন চরম অভাব-অনটন আর ঋণের ঘূর্ণিপাকে বন্দি হয়ে পড়েছে।
কয়রার খবর-এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সুন্দরবনের সংরক্ষিত এলাকা বৃদ্ধি, বনদস্যুদের উৎপাত, অসাধু দাদন ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের দৌরাত্ম্য এবং বনসম্পদ আহরণে নানা বিধিনিষেধের কারণে গত এক দশকে বননির্ভর মানুষের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে মাছ, কাঁকড়া, মধু ও গোলপাতা সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করা পরিবারগুলোর অনেকেই এখন বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করছেন কিংবা এলাকা ছেড়ে অন্যত্র কাজের সন্ধানে চলে যাচ্ছেন।
বাংলাদেশ অংশে সুন্দরবনের মোট আয়তন ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। কয়রার খবর কে জানান স্থানীয়রা যে, খুলনার কয়রা উপজেলার প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই বনের ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ২০ লাখ মানুষ মাছ, কাঁকড়া, মধু ও বনজ সম্পদ আহরণের মাধ্যমে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালে সুন্দরবনের সংরক্ষিত এলাকা ২৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫২ শতাংশ করা হয়। এতে বনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ইতিবাচক প্রভাব পড়লেও বিপাকে পড়েছেন বননির্ভর সাধারণ মানুষ। সম্পদ আহরণের সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় অনেকের আয় যেমন কমে গেছে, তেমনি কেউ কেউ পেটের তাগিদে অবৈধভাবে বনে প্রবেশ করে আইনগত ঝুঁকিতেও পড়ছেন।
সরেজমিনে কয়রার মহেশ্বরীপুর, তেঁতুলতলার চর, মঠবাড়ি, কাশিয়াবাদ, পাথরখালী, মাটিভাঙ্গা, গিলাবাড়ি, জোড়শিং ও গোলখালীসহ সুন্দরবনসংলগ্ন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ জেলেই দাদনের টাকায় সংসার চালাচ্ছেন। বনে প্রবেশ বন্ধ থাকলে তাদের আয়ও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। তখন বাধ্য হয়ে সংসার চালাতে এনজিও বা দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হয়। পরবর্তীতে হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে মাছ বিক্রি করলেও সেই অর্থের সিংহভাগ চলে যায় কিস্তি আর দেনা পরিশোধে।
মঠবাড়ি গ্রামের বনজীবী রমেন মণ্ডল ক্ষোভ প্রকাশ করে কয়রার খবর-কে বলেন, "বনের ঘাটে ঘাটে টাকা দিতে হয়। পাসের খরচ, বনদস্যুর চাঁদা ও নানা আনুষঙ্গিক খরচ দিয়ে মাছ ধরে যা পাই, তা দিয়ে সংসার চলে না। তাই এ বছর আর বনে যাইনি, মহাজনের কাছ থেকে ধারদেনা করে চলছি।"
একইভাবে ৬ নম্বর গ্রামের জেলে রজব আলী বলেন, "সরকার যদি সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থা করত, তাহলে আমরা দাদনের এই মরণফাঁদ থেকে বাঁচতে পারতাম।" চরম লোকসানের গল্প শুনিয়ে ৬ নম্বর কয়রা গ্রামের জেলে আবু তালেব সরদার জানান, গত বছর মাছ ধরে তাঁর ১০ হাজার টাকার বেশি লোকসান হয়েছে। বছরের অনেক সময় বনে যাওয়া বন্ধ থাকে, আর যে কয়দিন যাওয়া যায়, তখনও আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। দাদনের চাপে তারা ক্রমান্বয়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন।
সুন্দরবনকেন্দ্রিক উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ইনিশিয়েটিভ ফর কোস্টাল ডেভেলপমেন্টের (আইসিডি) প্রতিষ্ঠাতা মো. আশিকুজ্জামান বলেন, বনজীবীদের জন্য সরকারি উদ্যোগে বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে পরিবেশবান্ধব পর্যটন, কাঁকড়া ও মাছের চাষ এবং আধুনিক পদ্ধতিতে মৌচাষসহ নানা কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে বনজীবীদের জীবনমান যেমন উন্নত হবে, তেমনি সুন্দরবনের ওপর থেকেও মানুষের চাপ কমবে।
এ বিষয়ে খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহম্মেদ বলেন, সুন্দরবন সংরক্ষণের পাশাপাশি বননির্ভর মানুষের জীবিকার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বনজীবীদের বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরিতে বন বিভাগ ইতিমধ্যেই বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের অন্য পেশায় যুক্ত করার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সবশেষ খবর সবার আগে পেতে "কয়রার খবর" - এর সাথেই থাকুন। নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের koyrarkhobor.com ভিজিট করুন।
This theme has been developed by OURISLABD.

Post a Comment