কয়রায় প্রধান শিক্ষক ও দুই শিক্ষিকার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির পাহাড়:অভিভাবককে মামলার হুমকি
নাজমুস সাকিব | কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি | কয়রার খবর
খুলনার কয়রা উপজেলার মাথাভাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জিএম সোহরাব হোসাইন এবং দুই সহকারী শিক্ষিকা কুলসুম নাহার ও জাহিদা খাতুন (পারুল)-এর বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও অভিভাবককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গত ২ জুলাই ২০২৬ তারিখে বিদ্যালয়ের সামনে এলাকাবাসী ও সংক্ষুব্ধ অভিভাবকরা এসব অপকর্মের প্রতিবাদে একটি বিশাল মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন।
উক্ত মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করে বলেন, প্রধান শিক্ষক জিএম সোহরাব হোসাইন নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকেন না। অনেক সময় তিনি অত্যন্ত শৃঙ্খলা পরিপন্থীভাবে লুঙ্গি ও গামছা পরে বিদ্যালয়ে আসেন এবং বিদ্যালয়ের মাঠটিকে নিজের ব্যক্তিগত সবজি চাষের জমিতে পরিণত করেছেন। এছাড়া সরকারের দেওয়া স্লিপের টাকা, বিভিন্ন বাজেটের বরাদ্দ এবং নিরীহ শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ তোলা হয় তার বিরুদ্ধে।
"কয়রার খবর"-এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সহকারী শিক্ষিকা কুলসুম নাহার দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত থাকলেও প্রধান শিক্ষক মোটা অঙ্কের সুবিধা বা প্রভাবের কারণে গোপনে তার হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর দেখিয়ে আসছেন।
মাথাভাঙ্গা গ্রামের ডিপ্লোমা চিকিৎসক মো. আকরাম হোসেন (লিটন) ক্ষোভ প্রকাশ করে কয়রার খবর-কে জানান, তার ছেলে মোসাদ্দেক নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও প্রধান শিক্ষক তার হাজিরা না দিয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির নির্বাচনকে সামনে রেখে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার ভর্তি বাতিল করেন। মোসাদ্দেকের মা মমতাজ পারভীনও দাবি করেন, তার ছেলে নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেত এবং বিদ্যালয় থেকে দেওয়া বিস্কুটও প্রতিদিন নিয়ে আসত। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মৃণাল কান্তি সরকারও মোসাদ্দেকের নিয়মিত আসার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির নির্বাচন এলেই প্রধান শিক্ষক বাইরের গ্রামের কোনো পকেট ব্যক্তিকে সভাপতি করার নোংরা চেষ্টা চালান। এবারও একই উদ্দেশ্যে এলাকার একজন ডিগ্রিধারী অভিভাবকের সন্তান মোসাদ্দেকের ভর্তি অবৈধভাবে বাতিল করা হয়েছে। বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি ও সাবেক সেনাসদস্য জিএম মাহবুবুর রহমান অভিযোগ করেন, প্রধান শিক্ষক এতটাই বেপরোয়া যে তিনি সভাপতির স্বাক্ষর পর্যন্ত জাল করেছেন। অপর সাবেক সভাপতি ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আছাবুর রহমান তাকে একজন চরম অসৎ মানুষ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। বিদ্যালয়ের বর্তমান সভাপতি ও মাধ্যমিক শিক্ষক শ্রী সমিরণ কয়রার খবর-কে বলেন, "আমি প্রধান শিক্ষকের কাছে বিভিন্ন অর্থ ব্যয়ের হিসাব চেয়েছি, কিন্তু তিনি এখনও কোনো হিসাব দিতে পারেননি।"
এদিকে সহকারী শিক্ষিকা জাহিদা খাতুন (পারুল)-এর বিরুদ্ধেও চাকরিতে নিয়োগসংক্রান্ত গুরুতর জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যালয়ের তৎকালীন সভাপতি শাহ মো. আহসান হাবীব দাবি করেন, সরকারি চাকরিতে নিয়োগের নির্ধারিত বয়সসীমা অতিক্রম করার পরও সম্পূর্ণ অবৈধ উপায়ে তিনি নিয়োগ পেয়েছেন। এছাড়া মাথাভাঙ্গা গ্রামের আজিজুল সানের মেয়ে আজমিরা, একই গ্রামের সাইদুল শাহের ছেলে এবং আকরাম হোসেনের ছেলের উপবৃত্তির টাকা প্রধান শিক্ষক নিজের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে প্রতারণামূলকভাবে উত্তোলন করেছেন বলে অভিভাবকরা অভিযোগ করেন।
এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে মানববন্ধন করায় ক্ষিপ্ত হয়ে প্রধান শিক্ষক জিএম সোহরাব হোসাইন, সহকারী শিক্ষিকা কুলসুম নাহার ও জাহিদা খাতুন মিলে মানববন্ধনে অংশ নেওয়া অভিভাবক ও ডিপ্লোমা চিকিৎসক মো. আকরাম হোসেন (লিটন)-কে বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়েছেন। প্রধান শিক্ষক জিএম সোহরাব হোসাইন আরও বলেন, "আমরা কয়রা উপজেলা ও জেলা শিক্ষা অফিসে টাকা দেয়। টিও এটিওসহ সবাই প্রতি মাসে টাকা পায় তোরা আমার বিরুদ্ধে কিছু করতে পারবি না। স্কুল নিজেই ভাঙচুর করে তোর নামে উল্টো মামলা দিয়ে দেব।"
হুমকিদাতা সহকারী শিক্ষিকা জাহিদা খাতুন বলেন, "আমার স্বামী শিক্ষক ও সাংবাদিক। তার মাধ্যমে তোর বিরুদ্ধে পত্রিকা ও টেলিভিশনে মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ করাব।" অপর সহকারী শিক্ষিকা কুলসুম নাহার হুমকি দিয়ে বলেন, "আমার ছেলে বাহিনীতে চাকরি করে এবং আমার স্বামীর বন্ধু বিএনপি নেতা বাবুলকে দিয়ে তোকে রাস্তায় ফেলে মারধরের ব্যবস্থা করব।" মাথাভাঙ্গা গ্রামের ভেটেরিনারি চিকিৎসক এস. এম. নাসির উদ্দীন এবং মাথাভাঙ্গা জামে মসজিদের সভাপতি সার্জেন্ট (অব.) ফজলুল হক সানা (বাংলাদেশ সেনাবাহিনী) এই হুমকির বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, প্রধান শিক্ষক ও দুই সহকারী শিক্ষিকার বিরুদ্ধে যেসব দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, তার সবকটি সত্য।
এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রধান শিক্ষক জিএম সোহরাব হোসাইনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। এলাকার সচেতন মহল ও অভিভাবকরা এই দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি ও আনুষ্ঠানিক তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জোরালো দাবি জানিয়েছেন।
সবশেষ খবর সবার আগে পেতে "কয়রার খবর" - এর সাথেই থাকুন। নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের koyrarkhobor.com ভিজিট করুন।
This theme has been developed by OURISLABD.

Post a Comment