কয়রায় জাল সনদে ‘ডাক্তার’ পরিচয়: বছরের পর বছর চিকিৎসা ও বিপুল লিকুইড অ্যালকোহল মজুদের অভিযোগ
মুশফিকুর রহমান | কয়রা প্রতিনিধি | কয়রার খবর
কয়রা (খুলনা): খুলনার কয়রায় ভুয়া রেজিস্ট্রেশন নম্বর ও সনদ ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে টি এম আকবর হোসেন নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। শিক্ষাগত ও পেশাগত কোনো বৈধ সনদ না থাকা সত্ত্বেও তিনি চেম্বার খুলে রোগীদের সাথে প্রতারণা করে আসছেন। শুধু তা-ই নয়, ড্রাগ লাইসেন্স ছাড়াই তার দখলে বিপুল পরিমাণ হোমিওপ্যাথিক লিকুইড অ্যালকোহল মজুদের তথ্যও পাওয়া গেছে।
কয়রা সদর ইউনিয়নের পল্লীমঙ্গল এলাকার নিজ বাসভবনে নিয়মিত চেম্বার পরিচালনা করছেন এই কথিত চিকিৎসক। কয়রার খবর -এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত বুধবার (২২ জুলাই) বিকেলে তার চেম্বারে একযোগে ১০ থেকে ১২ জন রোগী চিকিৎসাসেবা নিচ্ছিলেন। সেবা নিতে আসা লুৎফরনেছা খাতুন নামের এক নারী জানান, তিনি স্তনের টিউমারের চিকিৎসার জন্য সেখানে গিয়েছেন। অন্যদিকে শারমিন আক্তার নামের এক রোগী শ্বাসকষ্টের এবং আমেনা বেগম নাক, কান ও গলা সংক্রান্ত জটিলতার চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, কোনো প্রকার বৈধ ডিগ্রি ছাড়াই বহু রোগীকে বিভিন্ন জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
রেজিস্ট্রেশন নম্বর ব্যবহারের বিষয়ে কয়রার খবর -এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চেম্বারের সামনের সাইনবোর্ডে D.H.M.S (ঢাকা) রেজিস্ট্রেশন নং-২৭৩২, H.M.P (ঢাকা) রেজিস্ট্রেশন নং-৮২০৫ এবং L.M.A.F.P (ঢাকা) রেজিস্ট্রেশন নং-৩২৬৭ লেখা রয়েছে। তবে এসব নম্বর বা ডিপ্লোমা সংক্রান্ত কোনো আইনগত বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেননি অভিযুক্ত আকবর হোসেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তিনি মাত্র এসএসসি পাস হলেও নিজেকে বহু বছর ধরে চিকিৎসক হিসেবে জাহির করে আসছেন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, কোনো স্বীকৃত ডিপ্লোমা না থাকা সত্ত্বেও তিনি নিয়মবহির্ভূতভাবে একই সঙ্গে হোমিওপ্যাথি ও অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। ভুল চিকিৎসার কারণে অনেক রোগী মারাত্মক শারীরিক জটিলতায় পড়েছেন এবং পরবর্তীতে খুলনা জেলা সদরসহ বিভিন্ন স্থানে গিয়ে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হয়েছেন।
ড্রাগ লাইসেন্স ছাড়া অ্যালকোহল মজুদের বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের খুলনা জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মলয় ভূষণ চক্রবর্তী তিনি কয়রার খবর - কে বলেন, "ড্রাগ লাইসেন্স থাকলেও লিকুইড অ্যালকোহল মজুদের একটি নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দেওয়া থাকে। তবে লাইসেন্স সম্পূর্ণ ব্যতিরেকে লিকুইড অ্যালকোহল মজুদে রাখা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। বিষয়টি খতিয়ে দেখে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।"
এসব অপরাধ ও অনিয়মের প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে অভিযুক্ত টি এম আকবর হোসেন কয়রার খবর কে জানান, হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার জন্য যে আলাদা সনদের প্রয়োজন হয় তা তার জানা ছিল না। একই সাথে লিকুইড অ্যালকোহল সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ড্রাগ লাইসেন্স লাগে সে বিষয়েও তিনি অজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একপর্যায়ে তিনি বিষয়টি অর্থ বিনিময়ে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালান।
ভুয়া চিকিৎসকের এই তৎপরতা সম্পর্কে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) রেজাউল করিম তিনি কয়রার খবর - কে বলেন, "পল্লী চিকিৎসক হিসেবে রোগীদের সেবা প্রদান করতে গেলেও স্বীকৃত কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে ডিপ্লোমা সনদ থাকা বাধ্যতামূলক। পাশাপাশি হোমিওপ্যাথিক লিকুইড অ্যালকোহল মজুদ কিংবা ব্যবহার করতে গেলে ড্রাগ লাইসেন্স থাকতেই হবে।"
তিনি আরও যোগ করেন, "জনসচেতনতার অভাবে এ জাতীয় অপচিকিৎসা ডালপালা মেলছে। ভুল ও অননুমোদিত চিকিৎসার দরুন রোগীরা চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারেন এবং এতে দীর্ঘমেয়াদে রোগীদের প্রাণহানির শঙ্কা থেকে যায়। বিষয়টি সরেজমিনে যাচাই করে উপজেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে অভিযান চালানো হবে।"
সামগ্রিক বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল্লাহ আল বাকী কয়রার খবর কে জানান, "ডিপ্লোমা সনদহীন কোনো পল্লী চিকিৎসক যদি চিকিৎসা কার্যক্রম চালান এবং ড্রাগ লাইসেন্স ছাড়া লিকুইড অ্যালকোহল মজুদ রাখেন, তবে তদন্ত সাপেক্ষে সত্যতা মিললে প্রচলিত আইনি ধারায় তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
এদিকে বছরের পর বছর ধরে এমন প্রতারণামূলক চিকিৎসা প্রকাশ্যে চললেও কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা। চিকিৎসানামে এই প্রতারণা বন্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সবশেষ খবর সবার আগে পেতে "কয়রার খবর" - এর সাথেই থাকুন। নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের koyrarkhobor.com ভিজিট করুন।
This theme has been developed by OURISLABD.

Post a Comment